কমবেশি প্রত্যেকের শরীরেই কিছু না কিছু সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি বড় সমস্যা হলো উচ্চ কোলেস্টেরল। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা (Cholesterol Control) বেড়ে গেলে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকেরা একে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলেন, কারণ অনেক সময় এই সমস্যার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ শুরুতে বোঝা যায় না। ফলে নীরবে একজন তরতাজা ব্যক্তির হঠাৎ হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি, হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পরিমাপ মতো খাওয়া-দাওয়া করলেই এই ধরনের রোগকেও বসে রাখা যায়। Vegan Brands: ভারতের ১০ ভেগান সংস্থা তৈরি করে বিউটি প্রোডাক্ট
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া উপায় (Cholesterol Control Home Remedies)
রসুন (Garlic): কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রে রসুনকে খুবই কার্যকর ঘরোয়া উপাদান বলা হয়। রসুনে থাকা ‘অ্যালিসিন’ নামের উপাদান রক্তে জমে থাকা এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১-২ কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেতে পারেন অথবা হালকা থেঁতলে একটু উষ্ণ জলেও খেতে পারেন। অনেকেই আছেন, কাঁচা রসুনের গন্ধ সহ্য হয় না। সেক্ষেত্রে রসুনের সঙ্গে একটু মধু মিশিয়ে নিতে পারেন।
মেথি (Fenugreek): মেথি দানা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খুব ভালো কাজ করে। এতে থাকা আঁশ অন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণ হতে বাধা দেয় । পাশাপাশি শরীর থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বের করে দিতে সাহায্য করে। ১ চা চামচ মেথি দানা এক গ্লাস জলে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন। সকালে জল ছেঁকে নিয়ে মেথি দানাগুলো ভালো করে চিবিয়ে খান। নিয়মিত খেলেই এর সুফল হাতেনাতে পাওয়া যাবে।
আমলকি (Amla): আমলকি শুধু হজমের জন্য নয়, হৃদযন্ত্র ভালো রাখার ক্ষেত্রেও খুব উপকারী। এতে থাকা ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালির ভেতরে চর্বি জমতে দেয় না এবং ধমনিকে সুস্থ ও নমনীয় রাখে। প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস হালকা গরম জলে ১ চা চামচ আমলকির গুঁড়ো মিশিয়ে খান অথবা টাটকা আমলকির রস খেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ২-৩ টে কাঁচা আমলকির দানা বা বীজটা ফেলে ভালো করে ব্লেন্ডার করে নিন। এরপর একটু গরম জলে একবার ফুটিয়ে নিয়ে সেই জলটা খেতে পারেন।
গোটা ধনে কমাবে কোলেস্টরল (Cholesterol Control with Coriander)
ধনে বীজ (Coriander Seeds): অনেকেই জানেন না যে রান্নার সাধারণ মশলা, ধনে কোলেস্টেরল কমাতে কতটা সাহায্য করে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দেয় এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। ২ চা চামচ ফ্রেস ধনে বীজ এক কাপ জলে ফুটিয়ে নিন। জল অর্ধেক হয়ে এলে নামিয়ে ছেঁকে নিন। দিনে দু’বার এই পানীয়টি খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়। যারা উচ্চ কোলেস্টরের রোগে ভুগছেন, তাঁদের অবশ্যই এই জল নিয়োমিত খাওয়া উচিত।
দারচিনি (Cinnamon): দারচিনি শরীরে ইনসুলিনের কাজ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি খারাপ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতেও উপকারী। দারচিনি রক্ত চলাচল ভালো রাখে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায়। প্রতিদিন সকালে চায়ের সঙ্গে বা হালকা গরম জলের সঙ্গে আধা চা চামচ দারচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে পান করুন। অথবা বিকেলে একটা ছোট দারচিনির টুকরো এক গ্লা, জলে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর ভালো করে ফুটিয়ে নিন। জলটি হাফ গ্লাস হয়ে আসলে, একটু ভালো করে ছাঁকনিতে ছেঁকে জলটা খেয়ে নিন।
গ্রিন টি (Green Tea): গ্রিন টি-তে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এটি রক্তনালির ভেতরে জমাট বাঁধা রোধ করে এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে। চিনি ছাড়া দিনে ২–৩ কাপ গ্রিন টি পান করার অভ্যাস করুন। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে এটি না খাওয়াই ভালো। এবং চেষ্টা করবেন, গ্রিন টি যেন কখনোই খুব বেশি গরম না হয়।
ওটস ও আঁশযুক্ত খাবার: কোলেস্টেরল কমাতে খাবারে আঁশ থাকা খুব জরুরি। ওটসে থাকা আঁশ কোলেস্টেরলকে আটকে রেখে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। সকালের খাবারে ওটস রাখুন। পাশাপাশি ব্রাউন রাইস, শাকসবজি এবং ফল—বিশেষ করে আপেল ও পেয়ারা—নিয়মিত খান।
স্বাস্থ্যকর চর্বি (Healthy Fat) ও ওমেগা–3: সব চর্বি শরীরের জন্য কিন্তু ক্ষতিকর নয়। কিছু ভালো চর্বি হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এক মুঠো কাঁচা বাদাম অথবা ১ চামচ ভেজে রাখা তিসি বীজের গুঁড়ো দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন। এছাড়াও ওমেগা-3 ক্যাপসুল রোজ শরীর চর্চার আগে একটা করে খেতে পারেন।
লাইফস্টাইলের পরিবর্তন প্রয়োজন (Lifestyle Change for Cholesterol Control)
- শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন। এতে শরীরের ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে।
- তেলে ভাজা খাওয়া কমান: ডুবো তেলে ভাজা খাবার, ডালডা এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলুন। সর্ষের তেল, ময়দা, চিনি, মিষ্টি-এগুলো একদম কোনোভাবেই খাওয়া চলবে না।
- ঘুম ও মানসিক শান্তি: প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমান। মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম বা ধ্যানের অভ্যাস করুন।
ঘরোয়া উপায় কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও, যদি আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি থাকে বা আপনি হৃদরোগের ওষুধ খান, তাহলে নতুন কোনো অভ্যাস শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, ঘরোয়া উপায় ওষুধের বিকল্প নয়—এগুলো সহায়ক মাত্র।একইসঙ্গে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ কোনো একদিনের কাজ নয়। নিয়মিত ঘরোয়া উপায় মেনে চলা এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে আপনাকে সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন উপহার দিতে। আজ থেকেই রান্নাঘরের সহজ উপাদানগুলোকে কাজে লাগান এবং সুস্থ থাকুন।