নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস, ফ্যাশন ও প্রাণীবন্ধু জীবনযাত্রার স্বীকৃতিতে পেটা (PETA) ইন্ডিয়া কলকাতাকে ২০২৫ সালের ‘নিরামিষ-বান্ধব শহর’ (Vegetarian City) হিসেবে পুরস্কৃত করেছে। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। আলু পোস্ত, ডাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যে বেলার ফুচকা । এমনকি জীবনযাত্রা-ফ্যাশন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়জনীয় দ্রব্যের ব্যবহারে প্রাণী হত্যা বা প্রাণীর ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য শহরকে পেছনে ফেলে দিয়েছে কলকাতা। PETA INDIA ‘মোস্ট বিউটিফুল ভেজিটেরিয়ান সেলিব্রেটি’ অশ্বিন-শ্রীলীলা
মাছে-ভাতে বাঙালির শহর কলকাতা নাকি ভেগানের তালিকায় শীর্ষে। কি চমকে গেলেন নিশ্চই ? যেটা শুনছেন, সেটা একেবারে ১০০ শতাংশ সত্য। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে ভেগান মাস (Vegan Month) উদযাপন করে পেটা ইন্ডিয়া (PETA India) । এবং সেইমতো দেশের বিভিন্ন শহরকে তারা বেছে নেয়। যেই শহরে মাছ-মাংস খাওয়ার পরিবর্তে নিরামিষ খাবারের প্রবণতা রয়েছে। এবার সেই তালিকায় নাম উঠে এল কলকাতার। PETA ইন্ডিয়া কলকাতাকে ২০২৫ সালের ভারতের সবচেয়ে ‘নিরামিষ-বান্ধব’ শহর হিসেবে মনোনীত করেছে। শুধুমাত্র খাবারের অভ্য়াসই নয়। পাশাপাশি, শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ফ্য়াশন বা লাইফ স্টাইলের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরষ্কার প্রদান করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র, ফিরহাদ হাকিমের হাতে এই পুরষ্কারটি তুলে দেওয়া হয়।
বাঙালি খাবারে অধিকাংশ মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি নিরামিষ (Vegan) পদ রয়েছে। আলু পোস্ত থেকে আলু চপ, ছোলার ডাল থেকে টমেটো-খেঁজুরের চাটনি, ফুচকা এবং আরও অনেক কিছু—এই অঞ্চলের নিরামিষ খাবারগুলো সাধারণত ঘি ছাড়া তৈরি করলে তা সম্পূর্ণ ‘ভেগান’ হিসেবেই গণ্য হয়। কলকাতার রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানগুলোও এ ব্যাপারে হতাশ করে না; ‘বার্মা বার্মা’-র সুস্বাদু স্টার-ফ্রাই, অনন্য সালাদ ও টোফু স্পেশাল থেকে শুরু করে ‘দ্য ফ্লেমিং বোল’-এর আধুনিক ও সৃজনশীল এশিয়ান খাবার তার প্রমাণ।
‘অ্যালডো ক্যাফে’, ‘আউট অ্যান্ড বিয়ন্ড’, ‘গ্লেনবার্ন ক্যাফে’ এবং ‘সিয়েনা স্টোর অ্যান্ড ক্যাফে’-র মতো ক্যাফেগুলোতে ভেষজ দুধ (প্ল্যান্ট মিল্ক) পাওয়া যায়, অন্যদিকে ‘দ্য ডেইলি’-তে ভেগান কেক (Vegetarian City) এবং আইসক্রিমও মেলে। ক্লাউড বেকারি ‘ওভেন টু প্লেট’ সম্পূর্ণ ভেগান এবং কলকাতা ভিত্তিক অনলাইন খুচরো বিক্রেতা ‘ভেগান ডেইলি’ আপনার সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দেয়—যার মধ্যে ভেগান (মক) সামুদ্রিক মাছও অন্তর্ভুক্ত, যাতে মায়ার সঙ্গে ‘মাছের ঝোল’ তৈরি করা যায়। পাশাপাশি, ‘ভেগান ওয়ার্ল্ড’ হলো পূর্ব ভারতের প্রথম ভেগান খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থা।

কলকাতার এই পশু-বান্ধব পরিচিতিকে আরও মজবুত করছে এখানকার প্রাণবন্ত ভেগান ফ্যাশন জগত। স্থানীয় ব্র্যান্ড ‘ইওরি’ (Eori™) উচ্চমানের, টেকসই ও সাশ্রয়ী উদ্ভিদ-ভিত্তিক চামড়া তৈরি করছে এবং ‘দ্য হাউস অফ গ্যাঞ্জেস’ বিভিন্ন ধরনের চমৎকার ফ্যাশনেবল সরঞ্জাম যেমন ব্যাগ, মানিব্যাগ, টোট ও স্লিং ব্যাগ অফার করছে, যা সবই বিলাসবহুল ভেগান লেদার দিয়ে তৈরি। চলতি বছরের শুরুর দিকে কলকাতায় পেটা (PETA) ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে প্রাণী-সচেতনতা বিষয়ক একটি দুর্গাপূজার প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন ভেগান স্ন্যাকস ছিল এবং ঘোড়ার গাড়ির পরিবর্তে হেরিটেজ-স্টাইল মোটরচালিত যান ব্যবহারের উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া শহরে ‘কলকাতা ভেগানস’ নামে একটি ক্রমবর্ধমান ফেসবুক কমিউনিটিও রয়েছে।
চমৎকার বাঙালি উদ্ভিদ-ভিত্তিক পদ থেকে শুরু করে টেকসই ভেগান ফ্যাশন এবং উৎসবের পশু-বান্ধব আয়োজন—সব মিলিয়ে কলকাতা ভেগান এবং ভেগান-অনুরাগীদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত ও আনন্দদায়ক গন্তব্য। পেটা ইন্ডিয়া কলকাতার (Vegetarian City) এই প্রসারমান ভেগান উদ্যোগগুলিকে সাধুবাদ জানাচ্ছে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য এবং বিশ্বকে সবার জন্য আরও দয়ালু করে তোলার প্রচেষ্টার জন্য। পেটা ইন্ডিয়া তাদের বহুল প্রচারিত ভিডিও প্রদর্শনী ‘গ্লাস ওয়ালস’-এর মাধ্যমে খাবারের জন্য পালন করা ও হত্যা করা প্রাণীদের চরম যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে।
পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে হাজার হাজার মুরগিকে মলমূত্র থেকে তৈরি হওয়া অ্যামোনিয়া গ্যাসে ভরা ঘিঞ্জি ঘরে আটকে রাখা হয় এবং তাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই মুরগি এবং অন্যান্য প্রাণীদের কসাইখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় ছোট যানবাহনে ঠাসাঠাসি করে ভরা হয়, যেখানে অনেকের হাড় ভেঙে যায়, শ্বাসরোধ হয় বা অন্যভাবে মৃত্যু ঘটে। কসাইখানায় অনেক সময় ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণীদের গলা কাটা হয়, আবার মাছ ধরার নৌকায় মাছগুলোকে শ্বাসরোধ করে মারা হয় বা জ্যান্ত অবস্থায় পেট চেরা হয়।
একজন ব্যক্তি ভেগান হওয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২০০ প্রাণীকে এই সীমাহীন কষ্ট ও ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারেন। এছাড়া, খাবারের জন্য পশু পালন জল দূষণ এবং জল ও ভূমির অত্যধিক ব্যবহারের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করতে বিশ্বজুড়ে ভেগান খাদ্যাভ্যাসের দিকে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত জরুরি।