এলাকার কিছু প্রোমোটারের দৌলতে শৈশব চুরি হয়েছে আগেই। স্মার্ট ফোন আর শপিং মল কৈশরের সমীকরণটাই বদলে ফেলেছে। মধ্যবিত্তের এখন একের রোজগারে সংসার চলে না। অগত্যা ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে দুজনেই বেড়িয়ে পরছেন জীবন-জীবিকার সন্ধানে। অন্যদিকে সন্তানের দেখভালের দায়িত্বে অন্য কেউ। ইদানিং বেসিক কিছু প্রয়োজন যোগাড় করতে গিয়ে, সাধারণ একটা সম্পর্কের সূত্রই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাচ্চারা কি চাইছে, তাঁদের মনের মধ্যে কি চলছে, এর হদিশ রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশু মনোবিদরা বলছেন, বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলার সময় আরও বাড়াতে হবে। তাদের সঙ্গে খেলতে হবে। কিন্তু সেসবের সুযোগ কোথায়! ফলে শৈশবেই দেখা দিচ্ছে হতাশা বা ডিপ্রেশন (Child Depression)। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। যে স্বাভাবিক গ্রোথ একজন শিশুর মস্তিষ্কের হওয়ার কথা, তা অনেক সময়ই বাধার মুখে পড়ছে। Period Care: ভালো থাকতে পিরিয়ডসের সময় কী করবেন?
শিশুদের ডিপ্রেশন বোঝার উপায় (Child Depression Detection)
শুনলে অবাক হবেন অন্তত ৫০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন ডিপ্রেশনে ভোগে। মাঝেমধ্যে একটু-আধটু মন খারাপ হয়। অথচ দেখা যাচ্ছে, সেই মন খারাপ ২ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও থামছে না। উল্টে ভীষণ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় কান্নাকাটি করছে। লেখাপড়ায় একদমই মন বসছে না। অনেক সময় দেখা যায়, তাকে কেউ ভালোবাসে না এমন ভাবনার কথা বারবার বলা। এমনকি তার জন্য পরিবারের বড়সড় ক্ষতি হতে পারে বলে সবসময় তটস্ত থাকা। এইসকল লক্ষণগুলো ধরা পড়লেই দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পরিজনকে আঁকড়ে ধরা: বাবা-মা’কে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে না চাওয়া। সারাক্ষণ বাবা মায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকা। আত্মীয়স্বজনের সামনে সবসময় একটু ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকা।
মিথ্যে কথা বলা: বার বার মিথ্যে কথা বলা। নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া পেটের ব্যথা বা অন্য কোনো কথা বলা।
জৈবিক পরিবর্তন: হঠাৎ করে খাবার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। বা কোনো কারণ ছাড়াই খাবার পরিমাণ খুব বেড়ে যাওয়া। এছাড়াও অতিরিক্ত ঘুমানো।
শৌচাগার সমস্যা: আগে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হঠাৎ বিছানায় প্রস্রাব করা বা টয়লেট ব্যবহারে অনীহা।
কেন শিশুরা বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনে ভোগে? (Reason behind Child Depression)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যেকোনো মানসিক রোগীর সমস্যা শুরু হয় ছোটকাল থেকেই। এরজন্য সাধারণত পরিবেশগত কারণ, জীবনের কোনো ঘটনা এবং বংশগতির প্রভাব থাকে।
শৈশবের মানসিক চাপ: ছোটবেলায় কোনো ট্রমা বা ভয় থেকে অনেক সময় ডিপ্রেশন শুরু হয়। কোনো শারীরিক নির্যাতন; শৈশবে পরিবারের কারো কাছে শারীরিক নির্যাতনের শিকার। অনেকদিন ধরে অসুস্থ থাকার জন্য অথবা অকালে (Premature) জন্ম নেওয়ার কারণেও শিশুর মনে প্রভাব পড়তে পারে।
স্কুল জীবনের চ্যালেঞ্জ : বাচ্চাদের ঘনঘন স্কুল পরিবর্তনের একটা প্রভাব সবসময়ই প্রধান কারণ বিষণ্ণতার। স্কুল চেঞ্জ করার ফলে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সমস্যা (Separation anxiety) হয়। সহপাঠীদের দ্বারা হেনস্তা বা বুলিং হওয়া, অথবা ADHD ও অটিজমের মতো সমস্যার কারণে তারা একাকীত্ব অনুভব করতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো ছাড়াও মাঝে মাঝে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে, যা অত্যন্ত বাস্তব একটি সমস্যা।
ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায় শিশুদের জন্য
একজন চিকিৎসক শুধুমাত্র ওষুধ দিয়ে কিছু হরমোনের স্বাভাবিকতাকে বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু একজন বাচ্চার আচরণ কেমন হবে, তাকে ঠিক কোন পরিবেশের মধ্যে বড় করে তোলা হবে, তা নির্ভর করে তার বাবা-মায়ের উপর। শুরুতেই একটা কথা খুব ভালো করে বোঝা দরকার, শিশুদের অনেক বেশি সময় দিতে হবে। মনে রাখতে আপনি আপনার ঘরের বাচ্চাকে যত বেশি সময় দেবেন, তার সম্পর্কে তত বেশি বুঝতে পারবেন। আসুন বিষয়গুলো আরও ভালো করে বোঝা যাক।

- কথা শুনুন: মন দিয়ে কথাগুলো শুনুন। কি বলতে চাইছে এবং কেন বলছে তার সেই অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। বন্ধুর মতো আচরণ করুন। যাতে তার দুঃখ-কষ্ট সব কথা আপনাকে বলতে পারে। কোনো কথা যেন বলতে ভয় না পায়।
- রুটিন মেনে চলা: বাড়িতে একটা রুটিন ফলো করতে হবে। এটা করতেই হবে। নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে ওঠা। ঠিক সময় খাওয়া। এবং অবশ্যই ভালো খাবার (পুষ্টিতে ভরপুর) বেশি করে খাওয়ানো।
- খেলার উৎসাহ দিন: শিশু অনিচ্ছুক হলেও তাকে হালকা খেলাধুলা বা শারীরিক পরিশ্রমের কাজে উৎসাহিত করতে হবে।
- স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ: আপনার শিশুর শিক্ষকের সঙ্গে নিয়োমিত কথা বলুন। স্কুল যেন তার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ হয়, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

পেশাদার চিকিৎসা পদ্ধতি
- কাউন্সেলিং বা থেরাপি: কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) শিশুদের নেতিবাচক চিন্তা পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
ওষুধ: সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট পরামর্শ দিতে পারেন, তবে তা কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। - মনে রাখবেন বিষণ্ণতা একটি নিরাময়যোগ্য সমস্যা। ধৈর্য, সঠিক চিকিৎসা এবং পরিবারের ভালোবাসার মাধ্যমে শিশুরা আবার তাদের প্রাণচঞ্চল জীবনে ফিরে আসতে পারে।