২০২২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মিটিগেশন অফ ক্লাইমেট চেঞ্জ নামে ওই প্রতিবেদন অনুসারে মানুষ যদি মাছ মাংস ছেড়ে প্ল্যান্ট-বেসড খাওয়া-দাওয়ায় অভ্যস্ত হতে পারে, অর্থাৎ ভেগান হতে পারে তাহলে পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ অনেক বেশি সুস্থ থাকবে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাবে। কারণ সমীক্ষা বলছে, গরুর দুধ থেকে ভয়ঙ্করভাবে ছড়াচ্ছে বিষ (Milk Contamination)।
এই প্রতিবেদনে প্রতিবেদকরা বর্ণনা করেছেন কিভাবে উদ্ভিদভিত্তিক খাওয়া-দাওয়া যেমন ডাল, বাদাম, শাক-সবজি, ফল গ্রিন হাউস বায়ু নির্গমন রোধ করে পরিবেশকে সুস্থ করতে সাহায্য করে। তাছাড়াও আরো অন্যান্য সুবিধা রয়েছে যেমন হৃদরোগ, টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যাভ্যাস জনিত সংক্রামক রোগ থেকে মৃত্যুর হার হ্রাস করা। Winter Immunity: হলুদের সঙ্গে মধু, শীতে শরীর থাকবে ফিট
দ্য ল্যানসেট-এর প্রকাশিত রিপোর্ট কি বলছে ?
তবে মানুষের শরীর-স্বাস্থের পাশাপাশি পৃথিবীর স্বাস্থের খেয়ালও রাখতে হবে। আর এই কারণেই, ২০১৯ সালে “দ্য ল্যানসেট” এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য প্রাণিজ পণ্য ত্যাগ করে উদ্ভিদ ভিত্তিক খাবার কে আপন করে নেওয়া উচিত। পাশাপশি আরও বলা হয়েছে যে ভেগান খাদ্যাভাস গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাশে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
২০৫০ সালের মধ্যে যদি বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভাস গ্রহণ করা সম্ভব হয় তাহলে ১০ শতাংশ মৃত্যুর হার কমবে এবং গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমবে ৭০ শতাংশ। রাষ্ট্রসংঘের বিশ্ব পরিবেশ স্বাস্থ্যের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাংস বা দুধ থেকে তৈরি যেকোনো ধরণের খাবারের কারণেও কিন্তু পরিবেশ দূষণ হয়। আর সেই কারণে এর বিকল্প হিসেবে, ভেগান অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ উদ্ভিদভিত্তিক খাবার পরিবেশকে কখনোই ক্ষতির সামনে এসে দাঁড় করায় না।
মিথেন গ্যাসের পরিমাণ কেন বাড়ছে ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র (WHO) মতে পৃথিবীতে গবাদি পশুর সংখ্যা যত বেশি হবে। বিশ্ব উষ্ণায়ণের মাত্রাও তত বেড়ে যাবে। কারণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের অন্যতম কারণই হল, মিথেন গ্যাস। আর এই মিথেন গ্যাসের অন্যতম প্রধান উৎস গবাদি পশুদের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া। গরু বা মহিষ, এই ধরনের গবাদি পশুদের ঢেকুর থেকেও মিথেন গ্যাস বের হয়। এছাড়াও বর্জ্য, যেমন গোবর থেকেও মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। এখন যেহেতু বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে দুধ বা মাংসের চাহিদা ব্যাপকহারে রয়েছে, তাই আলাদা করে চাষ করে গবাদি পশুর সংখ্যা বাড়াতে হয়। ফলে স্বাভাবিকের থেকে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ বাড়তে থাকে।

ইতিমধ্যেই নিউজিল্যান্ড এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গবাদি পশু পালনের ওপর বিশেষ কর আরোপ করেছিল নিউজিল্যান্ড। গবাদি পশুর ঢেঁকুর কর । ফলে ২০৫০ সালের মধ্যেই তারা মিথেন নির্গমন ৪৭% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। যদিও দেশের কৃষকরা তা নিয়ে প্রতিবাদ করলে তার কিছু নিয়ম বদলাতে হয় সরকারকে। তাছাড়াও ডেনমার্কের জলবায়ু পরিষদ বিফ অর্থাৎ গরুর মাংসের ওপর ৩৩% কর আরোপের সুপারিশ করেছে। এর ফলে মাংসের লোভে গরুদের হত্যার হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়াও ঘোষণা করা হয়েছে যে ২/৩ মাংস গ্রহণ পরিবর্তন করতে হবে শাক সবজির সঙ্গে যার ফলে ক্লাইমেটের পরিবর্তনের সাথে লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে।
৫৭ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণই হল মাছ-মাংস
স্বাস্থ্যের পরেই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটির উপর আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো পরিবেশ। গ্যালাপ পোলের তথ্য অনুযায়ী দশ জনের মধ্যে সাত জন মানুষ পরিবেশ রক্ষার্থে মাছ মাংস ত্যাগ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে খাদ্য উৎপাদন থেকে যা গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয় তার ৫৭% আসে মাছ-মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য থেকে। গরুর মাংস সবচেয়ে বেশি নির্গমন ঘটায়। অপরদিকে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য থেকে নির্গমন মাত্র ২৯%।
একটি জলবায়ু ক্যালকুলেটর অনুসারে প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম গরুর মাংস খেলে বছরে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয় তা একটি গাড়ি ৭১৯৬ মাইল চলার সময়। বিপরীত দিকে প্রতিদিন ১৫০ গ্রাম ডাল খেলে টা মাত্র ৯৩ মাইল গাড়ি চালানোর সমান ক্ষতিকারক গ্যাস তৈরি হতে পারে। মাছ মাংস ডিম ইত্যাদির বদলে মানুষের জন্য ফল শাকসবজি সিম এবং শষ্য উৎপাদনে সরকারি ভর্তুকি স্থানান্তর করলে তা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে এবং মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। বিশ্বের পাঁচটি বৃহত্তম মাংস ও দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এক্সন মোবিল বা শেল-এর মত তেল কোম্পানিগুলোর চেয়েও বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে। যদি এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে মাংস ও দুধের খামার গুলো মোট গ্রীন হাউজ গ্যাস বাজেট ৮০% দখল করে নেবে।
৮৫টি দেশের খাদ্য নির্দেশিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে গরুর মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের ব্যবহার সীমিত করতে পারলে পরিবেশগতভাবে তা অনেক বেশি টেকসই হয়। আ্যামেরিকার ভেজিটেরিয়ান ডায়েট প্যাটার্ন অনুসরণ করলে সহজেই কার্বন ফুটপ্রিন্ট অর্ধেক হয়ে যাবে। ২০১৫ সালে মার্কিন ডায়েটারি গাইডলাইনস অ্যাডভাইজরি কমিটি জানিয়েছিল যে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যবস্তু যেমন শাকসবজি ডাল বাদাম ইত্যাদি প্রাণিজ পন্যের তুলনায় অনেক কম পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি করে।
মার্কিন মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশন ২০২২ এর জুন মাস থেকে এক নতুন নীতি নির্ধারন করে অনুসরণের জন্য। এর ফলে ক্লাইমেট চেইঞ্জ-এর ফলে মানুষের শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
‘দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ’-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৬% স্বাস্থ্যসেবা পেশাদার মনে করেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব। ৯০% পেশাদাররা মনে করেন ল্যানসেটের সমীক্ষার ফলাফল নীতি নির্ধারকদের জানানো আবস্যিক। তবে ৭৬% পেশাদার মনে করেন যে এই বিষয়ে তাদের আরও উচ্চতর শিক্ষার (CME) প্রয়োজন। ‘ফিজিশিয়ানস কমিটি’ (Physicians Committee) মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং এই বিষয়ে বিনামূল্যে অনলাইন কোর্স পরিচালনা করে থাকে।
মানুষ সচেতন হয়ে নিজেদের জীবনের পরিবর্তন আনা শুরু করলেই সুস্থ সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে একদিন ।