নিয়মিত বাইরের খাবার। অসময়ে ঘুম। এর সঙ্গে কাজের টেনশন থেকে শুরু করে সংসারের চাপ। সব মিলিয়ে অজান্তেই প্রতিদিন শরীরে বাসা বাঁধছে নানান জটিল রোগ। যার মধ্যে প্রায় কমবেশি ঘরে ঘরে যে রোগ দেখা যায়, তা হল ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্ত চাপ। তবে ঘরোয়া মা ঠাকুমাদের কিছু টোটকা আপনার ব্লাড প্রেশার (BP Control) পুরোটা না হলেও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনে দেবে। Vegan Smoothie for Glow: লাল-সবুজ ভেগান স্মুদি বাড়াবে জেল্লা
একজন তরতাজা মানুষকে কখন কাবু করে দেবে এই রক্তচাপ, তা বোঝাও যায় না। কারণ, মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে অকেজো করতে থাকে বলেই উচ্চ রক্তচাপকে নিরব হত্যাকারী (Silent Killer) বলা হয়। সুস্থ অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তচাপ হওয়া উচিত 120/80 mmHg। এটা স্বাভাবিক। এর ওপরে গেলেই সমস্যা। তাহলে ধরে নিতে হবে, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রক্তচাপের সূচক বর্ডার লাইনে থাকে। সেই সময় ওষুধের পরিবর্তে, নিয়োমিত শরীরচর্চা আর কিছু ঘরোয়া টোটকার মাধ্যমেই ব্লাড প্রেসারকে বসে আনা সম্ভব হয়।
কমাতে হবে নুনের ব্যবহার
অতিরিক্ত নুন রক্তের ঘনত্ব বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। তাই জন্য উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের সবচেয়ে বড় শত্রু নুন। রান্নায় প্রয়োজনীয় নুন ছাড়া বাড়তি নুন খাওয়া একদমই চলবে না। এছাড়াও বিভিন্ন খাবার যেমন চিপস, চানাচুর, আচার, সস ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে নুন থাকে। যা হয়তো সব সময় বোঝা যায় না। সুতরাং উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের উচিত এ সকল খাবার এড়িয়ে চলা।
কাঁচা রসুন খাওয়ার
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রসুন অত্যন্ত কার্যকর। রসুনে উপস্থিত অ্যালিসিন নামক উপাদান নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় যার ফলে রক্তনালী শিথিল থাকে এবং রক্ত চলাচল সহজ ভাবে হয়।
টোটকা: প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১-২ কোয়া রসুন কাঁচা চিবিয়ে খাওয়া অত্যন্ত উপকারী। যদি অন্যান্য কোন রোগ থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
পটাশিয়াম যুক্ত খাবার থাকুক ডায়েটে
অতিরিক্ত সোডিয়ামকে শরীর থেকে বার করতে পটাশিয়াম সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাই পটাশিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়া উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষদের অত্যন্ত জরুরী। আর এই কারণেই বেশি করে কলা, ডাবের জল, পালং শাক, আমন্ড, ডালিম – খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে । সকাল বেলা দুটো আমন্ড এবং ডালিম খাওয়ার অভ্যাস সহজেই রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করবে। তাছাড়া প্রতিদিন একটি করে কলা খাওয়াও উপকারী।
রোজ লেবু খান (BP Control with lemon)
ভিটামিন সি-র সবচেয়ে বড় উৎস লেবু। এছাড়াও লেবুতে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা রক্তনালীর দেওয়ালকে স্বাভাবিক রাখতে এবং স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। প্রতিদিন সকালে উষ্ণ গরম জলে অর্ধেক লেবুর রস মিশিয়ে, বাড়তি নুন বা চিনি ছাড়া পান করলে ধীরে ধীরে তা রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করবে।
বিটরুট-ডালিমের রসের ম্যাজিক (BP Control with beetroot)
বিটরুটের রস এবং ডালিমের রস দুটিই আয়রন-এ পরিপূর্ণ। একই সঙ্গে এই দুইয়ের মিশ্রণ একসঙ্গে খেলে রক্তনালীকে প্রসারিত করে এবং রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। হঠাৎ যদি কখনো রক্তচাপ বেড়ে যায় সেক্ষেত্রে এক গ্লাস বিট রুটের রস জাদু তরলের মত কাজ করে । মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে আনে। ১০০-১৫০ মিলি ডালিমের রস শুধু রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণেই নয়, হৃদযন্ত্রের সমস্যার জন্য অত্যন্ত উপকারী।
খালি পেটে মেথির জল, সরষের তেল ছাড়ুন
মেথি ও তিল ফাইবারে পরিপূর্ণ। তার ফলে এই দুই উপাদান কোলেস্টেরল কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। এক চামচ মেথি সারারাত জলে ভিজিয়ে রেখে সেই জল সকালে খালি পেটে পান করলে তা শরীরকে সচল ও সুস্থ রাখে। এছাড়াও খাবারে সাদা তেল বা সরষের তেলের পরিবর্তে তিলের তেল ব্যবহার করলে তা হৃদযন্ত্রের সমস্যা থেকে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি করে।
ঘন ঘন চায়ের অভ্যাস ছাড়ুন
অতিরিক্ত মাত্রায় চা-কফি রক্তচাপ কে বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ চায়ের পরিবর্তে জবা ফুলের চা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। জবা ফুলের পাপড়ি সেদ্ধ করে অনায়াসেই এক কাপ চা বানিয়ে ফেলা যায়। এটি প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত নুন বার করে রক্ত প্রণালীকে প্রশস্ত রাখে। জবা ফুলের চায়ের পাশাপাশি আদা চা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
নিয়মিত শরীরচর্চা
নিয়মিত শরীরচর্চা ব্যতীত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখা সম্ভব না। নিয়মিত হাঁটা, যোগ ব্যায়াম ইত্যাদি শরীরকে সচল এবং রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটলে হৃদযন্ত্র সচল থাকে এবং রক্ত চলাচলে সাহায্য করে।
মানসিক চাপ কমাতে পর্যাপ্ত ঘুম
বর্তমানে মানসিক চাপ সকল মানুষেরই উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। কাজের চাপ, পড়াশুনার চাপ, পারিবারিক সমস্যা ইত্যাদি রক্তচাপকে বাড়িয়ে তোলে। ইনসোমনিয়া বা অপর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ৭ থেকে ৮ ঘন্টা নির্বিচ্ছিন্ন ঘুম প্রত্যেকেরই প্রয়োজন। এছাড়াও নিয়মিত মেডিটেশন, যোগাসন, শ্বাসের ব্যায়াম খুবই কার্যকর। দিনে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজের শখের কাজ করা বা প্রিয় সিনেমা দেখা অথবা গান শোনা মানসিক চাপ কমাতে অনেকটাই সক্ষম। ব্যস্ততম দিনের মধ্যেও অন্তত আধঘন্টা সেই সব কাজের জন্য ব্যয় করা উচিত যা আমাদের আনন্দ দেয়। মানসিক শান্তি বজায় থাকলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সর্বোপরি মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন (BP Control with weight management)
বর্তমান জীবনযাত্রার সাথে মানুষ অত্যন্ত রকম নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ফাস্টফুড এর উপর। এর ফলে দেখ যাচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ও ওজন বৃদ্ধি। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে ৫ কেজি ওজন কমাতে পারলেও রক্তচাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। মানসিক অবসাদ এবং আরো বিভিন্ন মানসিক সমস্যার অন্যতম সমাধান ওজন নিয়ন্ত্রণ করা।
মেনে চলতেই হবে
- চা কফি রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী। দিনে ২ কাপের বেশি চা বা কফি খাওয়া যাবে না।
- নিকোটিনের ধোঁয়া রক্তনালী কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য একাংশভাবে দায়ী। মদ্যপান শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে যার ফলে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- যেই সব খাবার রক্তের ঘনত্ব বাড়ায় সেগুলো এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। যেমন রেড মিট, বিরিয়ানির মত ফাস্টফুড।
উপসংহার : উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা এবং তা কখনোই একদিনে সৃষ্টি হয় না। ধীরে ধীরে তা শরীরকে ভিতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে। চিকিৎসা এবং ওষুধের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাওয়া-দাওয়া, শারীরিক কসরত এসব রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। প্রথম থেকেই সচেতন হতে হবে কি কি খেলে শরীরে রক্তচাপ বাড়তে পারে সেই ব্যাপারে। মানসিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নিয়মিত রক্তচাপ এবং প্রাথমিক কিছু রক্ত পরীক্ষা নিয়মমাফিক করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই কোন ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত বিপদজনক। সচেতনার সাথে সুস্থ জীবন গড়ে তোলাই রোগের সাথে মোকাবিলা করার আসল চাবিকাঠি।