কোনোরকম রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার (Animal Testing) জন্য, খরগোশ বা ইঁদুরকে ব্যবহার করা যাবে না। মানুষের দৈনিক বিনোদন বা আমোদের শিকার কখনোই কোনো প্রাণী হতে পারে না। আর তা নিয়েই দীর্ঘদিন কাজ করে আসছে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা। কড়া আইনের মাধ্যমে এই সংস্থাগুলো খরগোশ, ইঁদুর বা এই ধরণের কোনো প্রাণীর উপর যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হয় সেই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে। এদের বক্তব্য খুব পরীষ্কার। পরীক্ষার জন্য প্রাণের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে তার বিকল্প রাস্তা খুঁজতে হবে। এবং সেইমতো কাজ করতে হবে। না হলেই, আইনত ব্যবস্থায় কড়া শাস্তি।
এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি বা EPA-র ভূমিকা
মার্কিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (EPA) প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা বন্ধ করার বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রাণিহীন পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত সংস্থাটির দীর্ঘদিনের চিন্তাধারারই প্রতিফলন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা মানুষ, বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশকে আরও কার্যকরভাবে রক্ষা করতে নির্ভরযোগ্য এবং প্রাসঙ্গিক পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। আধুনিক প্রাণিহীন পরীক্ষা পদ্ধতি এগিয়ে নিতে সংস্থাটি একটি ত্রি-মুখী (৩-pronged) কৌশল গ্রহণ করেছে।
আজকের এই ঘোষণাটি EPA এবং পেটা (PETA)-র বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ বছরের সহযোগিতার ফল। উদাহরণস্বরূপ, গত ৮২ বছর ধরে চোখের জ্বালাভাব (eye irritation) পরীক্ষার জন্য সাধারণত খরগোশের চোখে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হতো, যা তাদের চোখে প্রদাহ, আলসার, রক্তপাত, এমনকি অন্ধত্বের কারণ হতো। পেটার বিজ্ঞানীরা এই শতাব্দীপ্রাচীন পরীক্ষা বন্ধ করতে EPA-র সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ২০২৪ সালে EPA শিল্প রাসায়নিকের পরীক্ষার জন্য প্রাণিহীন পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতি তাদের পছন্দের কথা ঘোষণা করেছে।
কথার প্রতিফলন কাজে ঘটিয়ে, আজকের ঘোষণায় একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত খরগোশের পরীক্ষার (Animal Testing) পরিবর্তে প্রাণিহীন ‘স্কিন ইরিটেশন’ বা ত্বকের জ্বালাভাব পরীক্ষার প্রতি EPA-র অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
টক্সিসিটি বা বিষাক্ততা পরীক্ষায় পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগ
EPA-র সাথে পেটা বিজ্ঞানীদের সহযোগিতা এটিই প্রথম নয় যে পেটার বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা নির্ভরযোগ্য প্রাণিহীন পরীক্ষা পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০ বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পেটা এবং EPA-র যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, পাখিদের ওপর করা একটি পরীক্ষা থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। এর ফলে EPA তাদের নীতি পরিবর্তন করে। আগে পাখিদের দিনের পর দিন কীটনাশক মেশানো খাবার খাইয়ে তাদের কষ্টের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করা হতো এবং শেষে মেরে ফেলা হতো—এখন আর তার প্রয়োজন হয় না।
অন্য একটি উদাহরণে, পেটা বিজ্ঞানীরা EPA, অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এর লক্ষ্য ছিল প্রাণিহীন পদ্ধতিতে কীভাবে মানুষের সুরক্ষার মান বজায় রাখা যায় তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা। এই প্রচেষ্টার ফলে এমন একটি বাধ্যতামূলক পরীক্ষা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে যেখানে ইঁদুরদের দুই বছর পর্যন্ত প্রতিদিন রাসায়নিক গিলতে বা শ্বাস নিতে বাধ্য করা হতো। শেষে তাদের মেরে দেহ পরীক্ষা করা হতো। সম্প্রতি এই নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ১,৬০০ প্রাণীকে পরীক্ষার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
বিষাক্ত পরীক্ষায় প্রাণীদের ব্যবহার বন্ধ করতে এবং একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পেটা বিজ্ঞানীরা প্রতিটি পদক্ষেপে EPA-র সাথে কাজ করে যাবেন। এই নতুন যুগের লক্ষ্য হলো প্রাণীদের অসহনীয় কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়া এবং একই সাথে মানুষ ও পরিবেশকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করা। আমাদের বিজ্ঞানীদের দল প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা প্রতিস্থাপনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং শীঘ্রই এই বিষয়ে আরও ঘোষণা আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের জন্য পেটা-র সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
২০ বছর আগে PETA প্রথমবার EPA -র এজেন্ডায় প্রাণীদের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। লক্ষ্য ছিল, কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেন কোনোভাবেই কোনো প্রাণের ব্যবহার না হয়। আর তা নিয়েই বিজ্ঞানীরা, বছরের পর বছর গবেষণা করে যাচ্ছেন। এর জন্য কঠিন আইন তৈরি হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এখন কোনভাবেই প্রাণীদের ব্যবহার করা যায় না। করলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া আইনের আওতায় চলে আসবে।
এদিকে EPA-র বেশকিছু নিয়ম করেছে। এই যেমন কোনো রাসায়নিক (বিশেষত বিউটি বা কসমেটিকস প্রোডাক্ট তৈরিতে যা ব্যবহার করা হয়) মানুষ বা প্রাণীদের ব্যবহারের জন্য কতটা বিষাক্ত তার একটা পরিষ্কার তথ্য সংস্থাগুলোকে EPA-কে আগে থেকে জানাতে হয়।
পুরোনো আইনগুলো পরিবর্তনের জন্য নতুন প্রাণিহীন পদ্ধতিটি যে বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ এবং আগের পরীক্ষার চেয়ে “সমান বা উন্নত”, তা প্রমাণ করার প্রয়োজন হয়। এখানেই পেটা বিজ্ঞানীদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এই কঠিন বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো জোগাড় করেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আশ্বস্ত করেন। একবার তারা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হলে আইন পরিবর্তন করেন।
পুরোনো আইনগুলো পরিবর্তনের জন্য নতুন প্রাণিহীন পদ্ধতিটি যে বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ এবং আগের পরীক্ষার চেয়ে “সমান বা উন্নত”, তা প্রমাণ করার প্রয়োজন হয়। এখানেই পেটা বিজ্ঞানীদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এই কঠিন বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো জোগাড় করেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আশ্বস্ত করেন। একবার তারা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হলে আইন পরিবর্তন করেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
এই ঘোষণাটি একটি প্রথম ধাপ মাত্র, আরও অনেক কিছু আসা বাকি। আশা করা হচেছে EPA শীঘ্রই ত্বকের সংবেদনশীলতা, শোষণ এবং শ্বাসযন্ত্রের বিষাক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও প্রাণিহীন পদ্ধতির অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে নির্দেশিকা প্রকাশ করবে। এর ফলে কোম্পানিগুলো আত্মবিশ্বাসের সাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, আইন মেনে চলতে পারবে এবং প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা বন্ধ করতে পারবে।
দশকের পর দশক ধরে EPA স্বীকার করে আসছে যে আধুনিক প্রাণিহীন পদ্ধতিগুলো কম সময়ে বেশি রাসায়নিক পরীক্ষা করতে এবং পরিবেশকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে। আশা করা যায় আজকের এই অঙ্গীকার অদূর ভবিষ্যতে আরও প্রাণী-মুক্ত অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করবে—যা মানুষ এবং প্রাণী উভয়ের জন্যই জয়।