অসময়ে চুল ঝরে পড়ছে। মনে হচ্ছে, কিছুদিন পরেই হয়তো পুরো মাথা খালি (Hair Loss) হয়ে যাবে। মনে একটা ভয় কাজ করছে। আত্মবিশ্বাস কমে আসছে। তবে এটা কিন্তু একজন-দুজনের সমস্যা নয়। কম বয়সে চুল ঝরে পড়া একটা বড় সমস্যা। বিশেষ করে ২৬-৩৫ বছরের পুরুষ-মহিলা, উভয়েই এর থেকে মুক্তি খুঁজছে।
বেনিয়ম জীবনযাপন, হরমোনের পরিবর্তন বা জেনেটিকস কারণে বযসের আগেই চুল ঝড়ে পরছে। সাধারন ঘরোয়া কিছু পদ্ধতিতে সহজেই চুল পড়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেই সব ঘরোয়া টোটকা শুধু চুল পড়া কমাতেই নয় নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করবে। এই বিষয়ে হায়দরাবাদের কন্টিনেন্টাল হসপিটাল দশটি খুব সহজ উপায়ের কথা বিশ্লেষণ করেছে। এবং অবশ্যই এটি বিজ্ঞানসম্মত এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই ঠিক করা হয়েছে।
স্ক্যাল্প মাসাজ (Scalp massage): সঠিক পদ্ধতি মেনে নিয়মিত স্ক্যাল্প মাসাজ করলে তা চুলের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে এবং চুল পড়া কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত স্ক্যাল্প ম্যাসাজ অত্যন্ত আরামদায়ক এবং নিরাপদ। যদি চুল পড়ার সমস্যা অত্যধিক বেড়ে যায় সেক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়াই কাম্য। সঠিক উপায় মালিশ করলে তবেই তা ইতিবাচক ফল প্রদান করবে। রোসমেরি বা পেপার্মেন্ট অয়েল সহযোগে আঙুলের ডগা দিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করতে হবে কয়েক মিনিটের জন্য। এই পদ্ধতি নিয়োমিত করলে অনেক ভালো ফল পাওয়া যাবে।
নতুন চুল গজাতে ঘরোয়া উপায় (Hair Loss Treatment)
অ্যালোভেরা (Aloevera): ত্বকের যেকোনো সমস্যার জন্যই অ্যালোভেরা জাদুর মত কাজ করে। এটি ত্বকের আরাম প্রদানকারী উপকরণে ভরপুর। স্ক্যাল্পের সমস্যা কমিয়ে নতুন চুলে গজাতে সাহায্য করে। অ্যালার্জির সমস্যা না থাকলে অ্যালোভেরা ব্যবহার করা নিরাপদ। তবে ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়াই ভালো। বিশুদ্ধ এলোভেরা জেল স্ক্যাল্পে মেখে তা আধ ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা রেখে ভালো করে জল দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।
পেঁয়াজের রস (Onion juice): পেঁয়াজের রসে মজুদ রয়েছে সালফার। এটি হেয়ার ফলিকলস মজবুত করে এবং চুল পড়া কমিয়ে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। তবে এর জন্য বাজার থেকে সাধারণ পেঁয়াজ নয়। ছাঁচি পেয়াজ কিনে আনতে হবে। যদি সেটি অর্গানিক হয় তাহলে আরও ভালো। ছাঁচি পেঁয়াজের রস ভালো করে ছেঁকে তা স্ক্যাল্পে ম্যাসাজ করতে হবে। ১৫ থেকে ৩০ মিনিট রেখে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তবে সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনভাবেই তা চোখে ঢুকে না যায়। এছাড়াও অনিয়ন জুস সবার সহ্য নাও হতে পারে । বিভিন্ন সমস্যা দেখা যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে তা আর ব্যবহার না করাই ভালো।
নারকেল তেল বা ছাঁচি পেঁয়াজে কি আদৌ কাজ করবে ? (Hair Loss reduce With Coconut Oil)
নারকেল তেল (Coconut oil): নারকেল তেল চুলের পরিচর্যায় এক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ৮ থেকে ৮০ সবাই এর ওপর নির্ভরশীল। চুল মজবুত করতে ও স্ক্যাল্পের সমস্যার সমাধান করতে নারকেল তেল বহু যুগ ধরে তার জাদু দেখিয়ে আসছে। Postpartum Care: প্রসব পরবর্তী স্ট্রেচ মার্কস থেকে মুক্তির উপায়
যেকোনো রকম ক্ষয়ক্ষতির থেকে বাঁচার জন্য নারকেল তেল সবথেকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য। চুল পড়ার সমস্যা নিরাময়ে এই তেলের বিশেষ অবদান আছে। সুগন্ধী মুক্ত নারকেল তেল সাধারণত কোন ক্ষয়ক্ষতি করে না এবং সবাই নির্ভয়ে তা ব্যবহার করতে পারে। রাতে শোয়ার আগে উষ্ণ নারকেল তেল মাথায় ভালো করে মেখে তা সারা রাত রেখে পরদিন শ্যাম্পু করলেই কাজ সহজ হয়ে যাবে। তাতে চুল অনেক বেশি মসৃণ হবে। জটের সমস্যায় যারা ভোগেন, তাদের জন্য তো অত্যন্ত ভালো। তবে সাধারণত নাড়কেল তেলের সাইড এফেক্ট খুব একটা নেই বললেই চলে। তাও যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই একবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন।
জিনসেঙ (Ginseng): জিনসেঙ এক বিশেষ ভেষজ উপাদান যা চুলের গোড়াকে মজবুত করতে সাহায্য করে। তার সাথে চুলের ঘনত্ব বাড়ায়। এর বিশেষ কাজ হল স্ক্যাল্পের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং দ্রুত চুল গজাতে ও সাহায্য করা। কিছু সংস্থা রয়েছে, যারা একদম ঘরোয়া উপায়ে বা আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে জিনসেংয়ের নির্যাস তৈরি করে। সেই সমস্ত নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ্রিন টি বা রোজমেরি অয়েলে ম্যাজিক (Hair Loss reduce With Green Tea)
গ্রিন টি (Green Tea): গ্রিন টি প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পলিফেনলে পরিপূর্ণ। স্বাস্থ্যের জন্য এবং চুলের জন্য খুবই উপকারী। চুল এবং স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্য রক্ষায় গ্রিন টি বিশেষভাবে উপকারী। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে চুল মজবুত হবে এবং চুল পড়া কমবে। তাছাড়াও গ্রিনটির নির্যাস যুক্ত বাজার চলতি শ্যাম্পু বা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রিন টি সচরাচর খুব একটা ক্ষতিকারক নয়। তাই এর ব্যবহার বা পানে কোনো সমস্যা নেই। গ্রিন টি-র পাতাগুলো ভালো করে ফুটিয়ে নিয়ে তার চুলে লাগানো যেতে পারে। এছাড়াও গ্রিনটি যুক্ত যে কোন শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহার করলেও সুফল পাওয়া যাবে।
রোজমেরি তেল (Rosemary oil): রোজমেরি অয়েল স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্য বজায় রাখে, চুল পড়া কমায় এবং চুল গজাতেও সাহায্য করে। এতে রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল অ্যান্টি ফাঙ্গাল উপাদান। চুলের ঘনত্ব বাড়িয়ে চুলকে সুস্বাস্থ্যকর করে তুলতে রোজমেরী অয়েল বিশেষ ভূমিকা পালন করে। রোজমেরি অয়েলের সঙ্গে সামান্য নারকেল তেল বা জোজোবা তেল মিশিয়ে ঘনত্ব কমিয়ে নিতে হবে। রাত্রে শোয়ার আগে এই তেল মেখে শুতে হবে এবং পরদিন ভালো করে তা ধুয়ে নিতে হবে।

বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট (Biotin Supplement): বায়োটিনকে আমরা ভিটামিন বি ৭ নামেই চিনি। বায়োটিন কেরাটিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে চুলকে সুস্বাস্থ্যকর করতে সাহায্য করে। বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট চুলের ভিত মজবুত করে এবং দ্রুত ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাচায়। সচরাচর বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট অত্যন্ত নিরাপদ কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় তা সেবন করলে স্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকারক হতে পারে। ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট সেবন করা দরকার। এটি চুলের গ্রোথে সাহায্য করে।
ব্যালেন্সড ডায়েট (Balanced diet): ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সবকিছু পরিমাণ অনুযায়ী খাওয়াকেই ব্যালেনসড ডায়েট বলে। পুষ্টির অভাবে চুল পড়ার সমস্যা এবং বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। পুষ্টিকর খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে এইসব সমস্যা নির্মূল করা অত্যন্ত সহজ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিজেদের একটি আলাদা ডায়েট চার্ট তৈরি করে সেই অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া করলে সমস্যার সমাধান সহজেই লাভ করা যাবে।
চুল পড়ার সমস্যায় জর্জরিত নয় এরকম মানুষ আজকের দিনে খুবই কম। তবে এই দশটি সহজ পদ্ধতি মেনে চললে চুল পড়ার সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং চুলের ঘনত্ব বাড়বে। ঠিকমতন খাওয়া-দাওয়া, স্ক্যাল্পের সঠিক যত্ন এবং হাইজিন মেনটেইন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চুল পড়া কমলে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদা দুটোই বৃদ্ধি পাবে ও হারিয়ে যাওয়া হাসি আবার ফেরত আসবে।